অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি বিরোধী দলের

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আরোপিত ট্যাক্স ও ভ্যাট নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করার পাশাপাশি অবিলম্বে অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তাঁরা এ দাবি করেন।

জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলু অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশকরে বলেন, ‘আপনি পদত্যাগ করুন। বিদায় নেন। জনগণকে মুক্তি দিন। ’ দলটির আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘আপনার (অর্থমন্ত্রী) কাছে মাফ চাই। আপনি বিদায় নেন। ’

প্রথমে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর, পরে ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়া এবং শেষে প্যানেল চেয়ারম্যান ধীরেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথের সভাপতিত্বে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘বিধ্বস্ত মন্ত্রীর বর্ণাঢ্য রূপকল্প’ আখ্যায়িত করে জাতীয় পার্টির জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, ‘জনগণের ওপর ভ্যাটের বোঝা বাড়িয়ে বাজেটের ঘাটতি পূরণ করতে চান। ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হয়ে গেছে, অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে। জনগণকে কল্পনার ফানুস দেখিয়ে কী লাভ? গত ১১ মাসে যা পারেননি, বাকি মাত্র ১০ দিনে বাজেটের ৪০ শতাংশ কিভাবে খরচ করা সম্ভব? মিথ্যার বেসাতি দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। এক লাখ ১৬ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ। ব্যাংকগুলো থেকে লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে অথচ বাজেটে সে ব্যাপারে কোনো কথা উল্লেখ নেই। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ’

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন হিসেবে দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাবের কঠোর সমালোচনা করে জিয়াউদ্দিন বাবলু বলেন, ‘এটা কোনো নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না। এটা অনৈতিক কাজ। উনি নৈতিকতা ও আইনবিরোধী প্রস্তাব কিভাবে করেন? এ ধরনের প্রস্তাব উনি করতে পারেন না। অর্থমন্ত্রীর এই টাকা দেওয়ার কোনো অধিকার নেই। ’ তিনি বলেন, ‘ট্যাক্সপেয়ারের টাকা দিয়ে লুটের টাকার ঘাটতি পূরণের কোনো অধিকার নেই। এ জন্য তো উনাকে (অর্থমন্ত্রী) আইনের আওতায় আনতে হবে। অর্থমন্ত্রীকে এ জন্য আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। উনার বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল চার্জ আনা উচিত। ’

‘১৬ কোটি মানুষকে মুক্তি দিন’ : বাবলু বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর অনেক বয়স হয়েছে। তিনি শ্রদ্ধাভাজন। এখন তাঁর পদত্যাগ করা উচিত। অর্থমন্ত্রীকে বলব, আপনি পদত্যাগ করুন; বিদায় নিন। দেশের ১৬ কোটি মানুষকে মুক্তি দিন। আমাদের মুক্তি দিন। ’

‘বস্তিবাসীরাও আগামীতে অ্যাপার্টমেন্টে থাকবে’ : আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন প্রজেক্টরের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের নেওয়া বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পের ভিডিওচিত্র তুলে ধরেন। ওই সময় সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান। তাঁরা এই ফ্ল্যাট কিনতে পারবেন কি না জানতে চান। সবাই পারবেন বলে মন্ত্রী জানান।

ঝিলমিল প্রকল্পের ভিডিওচিত্র তুলে ধরে পূর্তমন্ত্রী বলেন, ‘বস্তিবাসীরাও আগামীতে অ্যাপার্টমেন্টে থাকবে। চীন, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশের মানুষ এখন অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে থাকে না। অ্যাপার্টমেন্টে থাকলে নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে। ঝিলমিল প্রকল্পে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। সেখানে প্রতিটি ২৫ তলা ভবনে স্যুয়ারেজ সিস্টেম, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও সোলার সিস্টেম থাকবে। সুলভে এই ফ্ল্যাট ক্রয় করা যাবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে রাজধানীতে বস্তিবাসীর জন্যও ফ্ল্যাট প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের ওপর হামলা প্রসঙ্গে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘এই সংস্কৃতি কে শুরু করেছে? ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন তাঁর মন্ত্রী ব্যারিস্টার সুলতান নিউ মার্কেট মোড়ে দাঁড়িয়ে থেকে পুলিশ পাহারায় আমার পায়ের রগ কেটে দিয়েছিল। আমার পিঠে ছুরি মেরেছিল। আমি তখন মরে যেতে পারতাম। ২০০৪ সালে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ওপর গ্রেনেড হামলা হয়েছে। বিএনপির শাসনামলে আমাদের আওয়ামী লীগের ২২ হাজার নেতাকর্মী নিহত হয়েছে। আর এই পাঁচ বছরে আমার এলাকায় মাত্র ২৯টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। ’ খালেদা জিয়া ও মওদুদের বাড়ি উচ্ছেদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হয়ে বেগম জিয়া অন্যায়ভাবে ক্যান্টনমেন্টের বাড়িতে ছিলেন। যখন উনাকে উচ্ছেদ করা হয়, উনি কেঁদেছিলেন। ওটা কি উনার পৈতৃক সম্পত্তি, নাকি উনার খরিদ করা বাড়ি ছিল? একইভাবে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ অবৈধভাবে ৫০ বছর গুলশানের বাড়ি দখল করে ছিলেন। সর্বোচ্চ আদালতের আদেশে তাঁকে সেই বাড়ি ছাড়তে হয়েছে। এখন খালেদা জিয়া বলছেন, সুযোগ এলে নাকি আমাদের এক কাপড়ে বিদায় করবেন। ’

‘১৫ ভাগ ভ্যাট দিয়ে অর্থমন্ত্রী ভোট নষ্ট করলেন’ : প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘দেশের মানুষের সঙ্গে শ্রেষ্ঠ তামাশা’ উল্লেখ করে জাতীয় পার্টির সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘নির্বাচন সামনে। জনগণের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিয়ে অর্থমন্ত্রী ভোট নষ্ট করলেন। তাই আপনার কাছে মাফ চাই, আপনার কাছ থেকে জনগণ আর কোনো বাজেট চায় না। ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্রে টাকা রাখতে পারবে না, তবে কোথায় রাখবে?’ তিনি আরো বলেন, ‘ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হচ্ছে, অর্থমন্ত্রী তাদের প্রটেকশন দিয়ে যাচ্ছেন। জনগণের ওপর ট্যাক্স বসিয়ে ধ্বংস হতে বসা ব্যাংকগুলোকে মূলধন দেবেন কেন? সৎসাহস থাকলে লুটপাটকারীদের নাম বলুন, জনগণ জানুক। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতরা আপনাদেরই লোক। লুটেরাদের প্রটেকশন দেবেন, আর গরিবদের ওপর ট্যাক্স বসাবেন—এটা কখনো মেনে নিতে পারি না। সরকার নিজেদের দুর্বলতা দেখতে পারছে না। শুধু শেখ হাসিনার ব্যক্তি ইমেজ, দক্ষতা ও প্রজ্ঞাই সরকারের একমাত্র সম্বল। ’

বাজেট সংশোধন হবে বলে আশা : অর্থমন্ত্রীর সমালোচনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ বলেন, ‘আমাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সম্পদের অপ্রতুলতা রয়েছে। তার পরও এই বাজেটের মাধ্যমে উজ্জ্বল ভবিষ্যতে পৌঁছানো সম্ভব। ’ তিনি বলেন, ‘সংসদের ভেতরে-বাইরে প্রস্তাবিত বাজেটের আলোচনা-সমালোচনা করা হচ্ছে। এই বাজেটের জন্য কোনো কোনো জায়গা থেকে অর্থমন্ত্রীকে আক্রমণ করা হয়েছে। কিন্তু এটাই চূড়ান্ত বাজেট নয়। ’ প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে প্রস্তাবিত বাজেট সংশোধন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। শামসুর রহমান শরীফ বলেন, উত্তরবঙ্গ পিছিয়ে পড়েছে অনেক আগেই। সেই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সারা দেশের সুষম উন্নয়নে কাজ করছেন তিনি।

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ বলেন, সারা বিশ্বই বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসা করলেও শুধু অগ্নিসন্ত্রাসী-নাশকতাকারী বিএনপি-জামায়াত অপশক্তি তা স্বীকার করে না। জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম বলেন, ‘খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে ক্যান্টনমেন্টে আরাম-আয়েশে থেকেছেন। অথচ তিনি মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জিয়াউর রহমানের নাম বিক্রি করে উনি (খালেদা জিয়া) রাজনীতি করেন। রাজনীতিকে কলুষিত করেছেন। বিএনপির ওপর হামলা করতে হবে না, বরং নিজেদের অতীতের অপরাধেই তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। ’

সরকারদলীয় সদস্য পংকজ দেবনাথ বলেন, ‘ব্রিটিশ আমল থেকেই আবগারি শুল্ক রয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের বছরে আবগারি শুল্ক বাড়িয়ে কেন বিএনপি-জামায়াত জোটের হাতে ইস্যু তুলে দিলাম? এ খাতে কয় টাকা পাবেন অর্থমন্ত্রী?’

জাতীয় পার্টির জিয়াউল হক মৃধা বলেন, ‘সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব যেভাবে অর্থমন্ত্রী রাবিশ বলে উড়িয়ে দেন, তেমনি জনগণও তাঁর এবারের বাজেটকে রাবিশ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। জনগণের জন্য দুর্ভোগের এই বাজেট সংশোধন করতে হবে। ’

আলোচনায় আরো অংশ নেন সরকারি দলের সদস্য রেজাউল করিম হীরা, মোতাহার হোসেন, জিল্লুল হাকিম, এ কে এম রহমতুল্লাহ, ফরিদুল হক খান, ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা, সাধন চন্দ্র মজুমদার, মো. হাবিবুর রহমান, মো. আয়েন উদ্দিন, শামসুল আলম, বেগম লুত্ফুন্নেছা, সিরাজুল ইসলাম মোল্লা, সাইমুম সরোয়ার কমল, শাজাহান কামাল, নাজিম উদ্দিন আহমেদ, আশেক উল্লাহ রফিক, বেগম পিনু খান এবং তরিকত ফেডারেশনের এম এ আউয়াল।

আপনার মন্তব্য দিন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ হবে না। Required fields are marked *