গ্রামের ঈদ -ড. আশরাফ পিন্টু

ঈদ মানে আনন্দ বা খুশি। আমার জীবনে এই ঈদের আনন্দ প্রথম কবে থেকে শুরু হয়েছে তা সঠিকভাবে বলা মুশকিল। মানুষের মস্তিষ্কে ৪/৫ বছরের স্মৃতি তেমন একটা থাকে না; যা থাকে তা আবছা আবছা। তবে ৭/৮ বছর বয়সের স্মৃতি অনেকটাই সজীব থাকে।
শৈশব বলি আর কৈশোর বলি- তখন ঈদ মানেই ছিল নতুন জামা-কাপড় পাওয়ার আনন্দ। এ জামা-কাপড় পরে ফিরনি-পায়েস খেয়ে আব্বা-আম্মা বা গুরুজনদের কদমবুসি করে ঈদের মাঠে যাওয়া। নতুন পোশাকের ঘ্রাণ একটু অন্যরকম লাগত শিশুবেলায়। আমার মনে আছে; আমি তখন প্রথম শ্রেণীর ছাত্র (১৯৭৬)। আব্বা সবার জন্য ঈদের পোশাক কিনে এনেছেন। আমার জন্য একটি শার্ট ও প্যান্ট কিনে এনেছেন। শার্ট-প্যান্ট পেয়ে আমি তো মহাখুশি! রাত্রিতে শোবার সময় সেগুলো সিথানে (বালিশের কাছে) রেখে ঘুমালাম। আমরা ৬ ভাইবোনের মধ্যে আমিই সবার ছোট। বাড়িতে আমার বয়সী কেউ নেই যে শার্ট-প্যান্টটি নিয়ে নিবে। তবুও কেন এমনটি করলাম- যা মনে হলে এখন হাসি পায়। তো পরদিন ঈদ। ঈদের মাঠে যাবো- শার্ট-প্যান্ট পরছি-কিন্তু বেল্টটি নতুন নয়, পুরাতন (এক বছর আগের)। এই নতুন বেল্টের জন্য আমি কাঁদতে শুরু করলাম। কান্না থামছে না কিছুতেই। আব্বা আমাকে ঈদগাহে নিয়ে যেতে পারলেন না। ঈদগাহ থেকে ফিরে এসে তিনি দেখলেন তখনো আমি কাঁদছি। আব্বা কিভাবে আমাকে থামাবেন কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না। গ্রামের বাড়িতে ঈদ করছি। আব্বা শহর থেকে ঈদের সব কেনাকাটা করে এনেছেন। গ্রামে কোনো দোকান নেই যে চাইলেই ছেলেকে একটা বেল্ট কিনে দিবেন।
আব্বার হাত ধরে যখন ঈদের মাঠে যেতাম তখন ঈদগাহের গেটের দু’পাশে অনেক ফকির থালা পেতে বসে থাকত। আব্বা আমার হাতে টাকা দিয়ে বলতেন ওদের সবাইকে দিয়ে দাও। আমি দু’হাতে প্রায় প্রতিটি ভিখারিকে খুচরো টাকা বিলাতাম। মাঠ থেকে ফিরে আব্বাকে বলেছিলাম- একজন-দুজনকে বেশি করে টাকা দিলেই তো হয়, এতজনকে দেওয়ার দরকার কী?
আব্বা জবাব দিয়েছিলেন, একজন-দুজনকে বেশি টাকা দেওয়ার চেয়ে অল্প অল্প করে সবাই পেলে ওদের সবার উপকার হবে।
আমি কৈশোর থেকেই লেখালেখি করতাম। আমার প্রথম লেখা (গল্প) প্রকাশিত হয়েছিল খুলনা ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত ‘মাসিক সপ্তডিঙা’ পত্রিকায় (১৯৮৪)। বর্তমানে পত্রিকাটি আর বের হয় না। ‘সপ্তডিঙা’র ঈদসংখ্যার জন্য আমি একটি একাঙ্কিকা লিখে পাঠিয়েছিলাম। এর নাম ছিল ‘ঈদের খুশি’। বিষয়বস্তু ছিলÑ ঈদের দিনে এক ধনীর দুলাল এক গরিব ছেলের খালি গা দেখে নতুন জামা দান করছে। কিন্তু একাঙ্কিকাটি ঈদসংখ্যায় ছাপা হলো না। এতে আমার খুব মন খারাপ হয়েছিল। কচি হাতের কাঁচা লেখার জন্যই হয়ত এমনটি হয়েছে। কিন্তু তা তখন বোঝাবে কে?
আমার আব্বা শহরে চাকরি করলেও আমরা প্রায় ঈদই গ্রামে দাদা-দাদির সঙ্গে করেছি। আমাদের পাশের গ্রামে রোজার ঈদে মেলা বসত। ঐ মেলায় বিভিন্ন ধরনের খেলনাসহ কদমা বাতাসা, নয়নঝুরি ইত্যাদি লোকখাবার পাওয়া যেত। সেই সাথে থাকত নাগরদোলা। আমি সর্বপ্রথম নাগরদোলায় চড়ি এই মেলাতেই। এ নাগরদোলা এখনকার মতো ইলেকট্রিসিটিতে চলে না। দু-তিন জন মানুষ হাত দিয়ে ঠেলে ঠেলে উপরে তুলে দেয়; পর্যায়ক্রমে তা নিচে নেমে আসে।
গ্রামের ঈদে আরেকটি পর্বের কথা মনে পড়ছ্;ে তাহলো- ঈদের নামাজ শেষে সমাজের মানুষ এক সঙ্গে বসে খিচুড়ি খাওয়া। এ খিচুড়ি প্রতিটি বাড়ি থেকে আসত জুমাঘরে। পাড়ার সব ছেলে-বুড়ো হৈ-হল্লা করে খিচুড়ি খেত। আমাদের বাড়ি থেকে আমিই (হয়ত ছোট বলে) খিচুড়ি নিয়ে যেতাম। আমি খিচুড়ি নিয়ে গেলেও তা গামলা থেকে আজরিয়ে (খালি করে) দৌড়ে বাড়ি চলে আসতাম। লজ্জাবশত (শহরের ছেলে বলে) হয়ত ওদের সাথে একসঙ্গে বসে খিচুড়ি খাওয়া হয়নি কিন্তু এখন মনে হয় ওদের সঙ্গে যদি আবার খিচুড়ি খেতে পারতাম! এ লোক-ঐতিহ্য এখনো গ্রামে চল আছে যা শহরে কোথাও চোখে পড়ে না।
শৈশব বা কৈশোরের মতো গ্রামে গিয়ে আর ঈদ করা হয় না। শহরে চোখ ধাঁধানো জৌলুস থাকলেও গ্রামের মতো অকৃত্রিম হাসি-আনন্দ এখানে নেই। তাই আমাদের শিশুদের শহরের ঈদ হয়ে উঠেছে রঙিন ফানুশ আর কৃত্রিমতায় সাজানো।

আপনার মন্তব্য দিন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ হবে না। Required fields are marked *