পাহাড় ধসে নিহত সংখ্যা বেড়ে ৯২

এসএম নিউজ ডেস্কঃ  টানা বর্ষণে পাহাড়ে তিন জেলা চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও বান্দরবানে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৯২ জনে পৌঁছেছে। বেড়েই চলছে এই লাশের সংখ্যা।
পাহাড় ধসে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৮৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রাঙামাটিতে ৬ সেনা সদস্যসহ ৫৯ জন, চট্টগ্রামে ১৯ জন ও বান্দরবানে ১০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অর্ধশতাধিক। নিখোঁজ রয়েছেন দুই সেনা সদস্যসহ আরও অনেকে। রাঙামাটিতে নিহতদের মধ্যে ৬ জন সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যও রয়েছেন।

এ ছাড়া চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে ডুবে পাঁচজন ও মহানগরের হালিশহর এলাকায় ঝড়ের সময় দেয়াল চাপা পড়ে একজন এবং রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলায় গাছচাপা পড়ে একজন নিহতের খবর পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার ভোররাত থেকে অভিযান চালিয়ে এসব লাশ উদ্ধার করা হয়। অভিযান এখনো চলছে। এসব ঘটনায় আহতের সংখ্যা অর্ধশতাধিক।

বঙ্গোপসাগরে থাকা নিম্নচাপের প্রভাবে গত রোববার রাত থেকেই টানা বৃষ্টি হচ্ছে সারা দেশে। সোমবার এটি বাংলাদেশের উপকূল ও স্থলভাগ অতিক্রম করে। এর প্রভাবে বৃষ্টির পরিমাণ আরো বাড়ে। টানা বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট তলিয়ে গিয়ে গ্রাম-শহরে দুর্ভোগে পড়ে মানুষ। এ কারণে চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর এবং কক্সবাজারে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত জারি করা হয়। অনেক স্থানে বন্ধ করে দেওয়া হয় নৌযান চলাচল। বন্ধ রয়েছে সড়ক যোগাযোগ ও বিচ্ছিন্ন রয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ।
প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

রাঙামাটি: শীর্ষ নিউজের রাঙামাটি প্রতিনিধ কামাল উদ্দিন জানান, টানা বর্ষণে পাহাড় ধসে রাঙামাটিতে ৬ সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যসহ ৫৯ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রাঙামাটি শহরে ১৮ জন, শহরের পাশে মানিকছড়ি এলাকায় ৬ সেনা সদস্য,  কাউখালী উপজেলায় ২১ জন, কাপ্তাই উপজেলায় ১২ জন ও বিলাইছড়ি উপজেলায় দুজন নিহত হয়েছে।

মঙ্গলবার সকাল থেকে জেলা শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে বেশ কিছু লাশ উদ্ধার করে রাঙামাটি সদর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাশের সংখ্যাও বাড়তে থাকে।

জেলার সিভিল সার্জন ডা. শহীদ তালুকদার জানান, পাহাড় ধসে রাঙামাটি শহরে ১৮ জন মারা গেছে। মানিকছড়ি এলাকায় মারা গেছেন চার সেনা সদস্য। এর মধ্যে সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন তানভীরের লাশ রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে এসেছে। এ ছাড়া আরো তিন সেনাসদস্য এখানে ভর্তি হয়েছেন।

অপর একিট সূত্র ৬ সেনা সদস্য নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে। নিহত দুই সেনা কর্মকর্তা হলেন- মেজর মাহফুজ ও ক্যাপ্টেন শামীম। অন্যদের নাম পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিহতদের মধ্যে রাঙামাটি শহরে ৮ জন। তারা হলেন, শহরের ভেদভেদি এলাকার রুমা আক্তার, নুড়িয়া আক্তার, হাজেরা বেগম, সোনালী চাকমা, অমিত চাকমা, আইয়ুস মল্লিক, লিটন মল্লিক, চুমকি দাস।

এছাড়া কাপ্তাইয়ে নিহত উপজেলার কারিগরপাড়া এলাকার বাসিন্দা অনুচিং মারমা ও নিকি মারমার পরিচয় মিলেছে। অন্যদের নাম পরিচয় জানা যায়নি।
রাঙামাটি এখন বিদ্যুৎবিহীন। যোগাযোগ ব্যবস্থাও অনেকটা বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) সাঈদ তরিকুল হাসান মানিকছড়ির ঘটনাস্থলে থাকা উদ্ধারকর্মীদের বরাত দিয়ে জানান, প্রবল বর্ষণে পাহাড় ধসে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়ক বন্ধ হয়ে যায়। সকালে সেই মাটি সরাতে কাজ করছিলেন সেনাসদস্যরা। তখন ওপর থেকে পাহাড় ধসে সেনাসদস্যদের ওপর পড়ে। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

সেনা সদস্য হতাহত হওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. রাশিদুল হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আজ সকাল ৭/৮টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। বর্ষায় পাহাড় ধসের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক পুনরুদ্ধারে গিয়েছিল সেনাবাহিনীর একটি দল। সংযোগ সড়ক পুনরুদ্ধার কাজে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় মানিকছড়ি এলাকায় সেনা কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।’

এ ছাড়া কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং এখনো কয়েকজন নিখোঁজ আছেন। সে কারণে হতাহতের সংখ্যা সঠিক বলা যাচ্ছে না বলেও জানান আইএসপিআরের পরিচালক।

পাহাড় ধসে কাউখালী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ২১ জন মারা গেছে বলে জানিয়েছেন কাউখালীর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল করিম ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) কমল বরণ সাহা। তবে নিহতদের নাম পরিচয় জানাতে পারেননি তারা।

কাপ্তাই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসে ১২ জন ও গাছচাপা পড়ে একজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন। এর মধ্যে কাপ্তাইয়ের রাইখালী ইউনিয়নের কারিগরপাড়া এলাকায় পাহাড় ধসে মারা গেছেন উনু চিং মারমা (৩০) ও নিকি মারমা (১২)।

ওই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছায়া মং মারমা এই তথ্য জানিয়েছেন। নিহত অন্যদের নাম-পরিচয় জানাতে পারেননি উপজেলা চেয়ারম্যান।

তিনি জানান, কর্ণফুলী নদীতে ইকবাল নামের এক ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন। গাছচাপা পড়ে নিহত ব্যক্তির নাম আবুল হোসেন।

এ ছাড়া বিলাইছড়ি উপজেলায় পাহাড় ধসে দুজন নিহত হয়েছেন বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

রাঙামাটির কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহম্মদ রশীদ বলেন, ‘এটা একটা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। মৃতের সংখ্যা আরো অনেক বাড়বে। শহরের যুব উন্নয়ন, ভেদভেদি, শিমুলতলি, রাঙাপানিসহ অনেক স্থানেই এখনো মানুষ মাটি চাপা পড়ে আছে।’

এদিকে, রাঙামাটি শহরের বেশির ভাগ এলাকাই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসের পর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন। এতে হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রাঙামাটি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে বাড়তি ইউনিট কাজে যোগ দিতে আসছে।

চট্টগ্রাম: শীর্ষ নিউজের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান আব্দুল্লাহ আল জামিল জানান, টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালী উপজেলায় পাহাড় ধসে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৯ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রাঙ্গুনিয়ার জঙ্গল বগাবিল এলাকায় ১৪ জন, চন্দনাইশের ধোপাছড়ি এলাকায় দুই পরিবারের চার সদস্য ও বাঁশখালীতে একজন নিহত হয়েছেন। রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে ডুবে মারা গেছে পাঁচজন।

এ ছাড়া ভোরে চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকায় ঝড়ের সময় দেয়াল চাপা পড়ে হানিফ নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ এসব তথ্য জানিয়েছে।

রাঙ্গুনিয়ার ঘটনাস্থল দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায়, পাহাড়ি ঢলে শঙ্খ ও সাঙ্গু নদীর পানি বাড়ায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। হতাহতের সংখ্যা আরো বাড়ার আশঙ্কাও করা হচ্ছে।

পাহাড়ি ঢলের কারণে রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় রাঙামাটি ও বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রামের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান আবু ইউছুপ চৌধুরী জানিয়েছেন, সোমবার রাতে উপজেলার ধোপাছড়ি ইউনিয়নে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী আসগর আলীর কাঁচা ঘরের ওপর মাটি ধসে পড়ে। এ ঘটনায় আজগর আলীর শিশুকন্যা মাহিয়া মাটির নিচে চাপা পড়ে মারা যায়। এ ছাড়া ছনবুনিয়া উপজাতিপাড়ায় একটি ঘরের ওপর পাহাড় ধসে একই পরিবারের দুই শিশু কেউচা কেয়াং (১০), মেমাউ কেয়াং (১৩) এবং গৃহবধূ মোকাইং কেয়াং (৫০) নিহত হন।

এ ঘটনায় ওই পরিবারের সানুউ কেয়াং (২১) ও বেলাউ কেয়াং (২৮) নামের আরো দুজন আহত হয়েছেন। তাদের বান্দরবান হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবু ইউছুপ চৌধুরী।

এদিকে অতিবর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে তিনদিন ধরে পানিবন্দি হয়ে আছে বন্দর নগরীর আগ্রাবাদ,বন্দরসহ বিভিন্ন এলাকার বেশির ভাগ মানুষ।

জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, চট্টগ্রাম শহরের একেক স্থানের জলাবদ্ধতার কারণ একেকটি। প্রত্যেকটির কারণ নির্ণয় করে তা অপসারণের কাজ করা হচ্ছে।

পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের যেকোনো মূল্যে সরাতে স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বান্দরবান: শীর্ষ নিউজের বান্দরবান প্রতিনিধি এইচ এম সম্রাট জানান, টানা বর্ষণে পাহাড় ধসে বান্দরবানে শিশুসহ ১০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ১১ জন।

মঙ্গলবার ভোরে বান্দরবানের লেমুঝিরি ভিতরপাড়া থেকে একই পরিবারের তিন শিশু, আগাপাড়ায় মা-মেয়ের এবং কালাঘাটায় এক কলেজছাত্রের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী স্টেশন অফিসার স্বপন কুমার ঘোষ।

নিহতদের মধ্যে ৬ জনের পরিচয় মিলেছে। তারা হলো- লেমুঝিরির বাসিন্দা সমুন বড়ুয়ার তিন সন্তান শুভ বড়ুয়া (৮), মিতু বড়ুয়া (৬) ও লতা বড়ুয়া (৪), আগাপাড়ার কামরুন নাহার (২৭) ও তাঁর মেয়ে সুখিয়া আক্তার (৮) এবং কালাঘাটার কলেজছাত্র রেবা ত্রিপুরা (১৮)। অন্যদের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরও কয়েকজন।

এছাড়া জাইল্লাপাড়ায় কামরুন্নাহার ও তার মেয়ে সুফিয়া (২০) নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কাজ করছে। আর গুরুতর আহত অবস্থায় দুইজনকে উদ্ধার করে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তারা হলেন- পসান ত্রিপুরা ও বীর বাহাদুর ত্রিপুরা।

সদর থানার ওসি মো. রফিক উল্লাহ এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে, অব্যাহত বর্ষণে ভোররাতে বাজালিয়ায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে, পাহাড় ধসে রুমা উপজেলার সঙ্গেও সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে দুদিন ধরে। অবিরাম বর্ষণে বান্দরবানে কয়েক সহস্রাধিক ঘরবাড়ি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। দুর্গত এলাকার মানুষ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছেন।

আপনার মন্তব্য দিন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ হবে না। Required fields are marked *