প্রতিহিংসা

 হাফিজুর রহমান বাবুঃ
সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র নাবিল। সে পড়া-শোনায় খুব ট্যালেন্ট। ৬ষ্ঠ শ্রেণীর বার্ষিক পরিক্ষা দিয়ে এবার ৭ম শ্রেণীতে ১ রোল হয়েছে। স্কুলের সব শিক্ষকের কাছে অনেক আদরের পাত্র সে। নাবিল যেমন পড়া-শোনাতে ভাল তেমনি তার আচার-আচরণও ভাল। এজন্যে সে বাবা মা ও আত্মিয়-সজনদের কাছেও স্নেহ এবং আদরের পাত্র। সপ্তম শ্রেণীতে তার একমাত্র প্রিয় বন্ধু মাসুদ। মাসুদও পড়া-শোনায় মোটা-মুটি ভাল। মাসুদের রোল ২। কিন্তু সে নাবিলের মত এত ভাল ও সৎ না। মাসুদের মাতা-পিতা অনেক বড়লোক। ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে মাসুদ ও নাবিল প্রতিযোগিতা করে পড়া-লেখা করেছিল। ওরা দুজনই প্রতিজ্ঞা করেছিলো যে, আমার রোল ১ হবে এবং মাসুদের রোলও ১ হবে। চললো তাদের লেখা-পড়ার প্রতিজ্ঞার প্রতিযোগিতা। কিন্তু বার্ষিক পরিক্ষার রেজাল্টে দেখলো যে, নাবিলের রোল ১ হয়েছে। এই দেখে মাসুদের মনে প্রচন্ড রাগ হোল এবং মনে মনে নাবিলের প্রতি হিংসা হল। সে ভাবতে থাকলো কিভাবে নাবিলকে হারানো যায় এবং কিভাবে ওর ক্ষতি করা যায়? তার মনে পরলো সাকিলের কথা। সাকিলও এক সময় তার ক্লাসফ্রেন্ড ছিল। কিন্তু কোন এক কারণে সাকিল পড়া বাদ দিয়েছে। পড়া-শোনা বাদ দিয়ে এখন সে বিড়ি-সিগারেট, মদ-গাজা সব খায়। এক সময় সাকিল নিজেও নাবিলের শত্র“ ছিল। মাসুদ ভাবলো অবশ্যই সাকিলের কাছে গেলে কোন একটা উপায় বের হয়ে আসবে। তাই মাসুদ ছুটে গেল সাকিলের কাছে। সাকিলের কাছে গিয়ে সব কথা খুলে বললো মাসুদ। সাকিল সব কথা শুনে মাসুদকে কানে-কানে একটা পরামর্শ দিল, এবং বললো যে, এইভাবে কাজ করতে পারলে তোর বিজয় সুনিশ্চিত। পরদিন সবাই স্কুলে গেলো ক্লাস করতে। মাসুদ ভাবলো এবার আমার কাজ শুর“ করতে হবে। প্রথম পেরিয়ড শেষ, এখন আব্দুস সাত্তার স্যারের ক্লাস। কিন্তু স্যারের জ্বর হয়েছে। তাই স্কুলে আসবে না। এজন্যে এই পেরিয়ডটি এখন ফাকা। তাই শুর“ করলো ওর কাজ। ও চলে গেলো তানিয়ার কাছে। তানিয়াও ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী, রোল ৪। গিয়ে বললো-
– তোকে একটা কথা বলবো, কিন্তু কি করে যে বলি?
– কেন কি হয়েছে বল?
তুই কিছু মনে করবি নাতো?
– না আমি কিছু মনে করবো না, তুই কি বলবি? বল।
– মানে আমি বলতে চাচ্ছি কি, নাবিল তোকে খুব পছন্দ করে। তোর যদি সম্মতি থাকে তাহলে নাবিল তোকে ভালোবাসতে চায়!
– মানে?
হ্যা, সত্যি।
– না এটা কখনই সম্ভব নয়।
– তানিয়া তুই একটি জিনিস ভেবে দেখ; নাবিল অনেক ভাল ছাত্র। ও বড় হয়ে অনেক টাকার চাকরি পাবে। তোরা অনেক সুখে থাকবি। আর তাছাড়াও ওর চেহারাটা তো খারাপ না। এখন তুই ভেবে দেখ!
এসব কথা শুনে তানিয়া মনে মনে অনেক ¯^প্ন আঁকতে থাকলো। মাসুদ আবার বললোÑ
– কোন উত্তর দিলি না যে?
কি উত্তর দিবো? তুই যেটাই ভাববি সেটাই হবে।
– ঠিক আছে তাহলে আগামি কাল ২য় পেরিয়ডেই তোদের দুজনের সামনা-সামনি কথা হবে। কারণ, কালকেও স্যার আসবে না। আমি এখন যাই। এই বলে চলে গেল মাসুদ।
আর মনে মনে ভাবতে লাগলো যে, কাজ হচ্ছে। এরপর চলে গেল নাবিলের কাছে। নাবিলকেও এসব কথা বললো মাসুদ। কিন্তু নাবিল নাকচ করে দিয়ে বললো, না তা কখনও সম্ভব নয়। তুই এখন আসতে পারিস, আমি এসবের মধ্যে নেই।
– এই নাবিল তুই একটু ভেবে দেখ। তানিয়া পড়া-লেখায়, রূপে-গুনে, আচার-আচরণে কোনো কিছুতেই কম নেই। আর তোর সঙ্গে দার“ণ মানাবে। তাছাড়া তানিয়াও তোকে অনেক ভালোবাসে। এখন তুই নিজেই ভেবে দেখ কি করবি?
নাবিল খুব চিন্তায় পড়ে গেল কি করবে সে? ভেবে দেখলো মাসুদের প্রস্তাব একদম খারাপ না।
সব চিন্তার পর নাবিল মাসুদকে বললো, ঠিক আছে তুই তানিয়াকে বলে দে আমি রাজি। তখন মাসুদ বললো, আচ্ছা তাহলে তোদের দুজনের সামনা-সামনি কথা হবে আগামি কাল ২য় পেরিয়ডে। এরপর সব ক্লাস শেষে ঘন্টা পরলো ছুটির। সবাই চলে গেল বাড়িতে। মাসুদ ছুটির পরে চলে গেল সাকিলের কাছে। সাকিল বললো-
– কিরে ঠিক মতো কাজ করতে পেরেছিস?
হ্যাঁ দোস্ত, ঠিক তোর কথা মতই কাজ হয়েছে।

– আচ্ছা তাহলে তুই নিশ্চিন্তে থাক আমি যা বলেছি তাই হবে।
– তাহলে দোস্ত আমি আজ আসি।
– আচ্ছা যা, আমাকে স্মরণ রাখিস।
মাসুদ চলে এলো বাড়িতে। তারপর দিন সবাই যথা নিয়মে চলে গেল স্কুলে। ১ম পেরিডের পর ২য় পেরিয়ডে মাসুদসহ নাবিল ও তানিয়া মুখোমুখি হলো। এক কথায় দুই কথায় খুব প্রিয় ও কাছের মানুষ হয়ে গেল। ক্লাস শেষে যার যার মতো বাড়ি চলে গেলো তারা।
দুজনই প্রতিদিনের ন্যায় মাগরিব নামায পরে পাঠ্য বই নিয়ে বসলো। কিন্তু একি দশা!? একি ব্যাপার!? পড়া-শোনা করতে মোটেও মন চাচ্ছে না। চাচ্ছে শুধু তানিয়ার সঙ্গে দেখা করতে, একটু কথা বলতে। তানিয়ারও একি অবস্থা, শুধু নাবিলকে দেখতে ইচ্ছে করছে। তাদের ছোট্ট বয়সে কচি মনে একি রোগ প্রবেশ করলো? পড়া-শোনা আর মোটেও ভাল লাগে না। এভাবে কয়েক সপ্তাহ পার হয়ে গেল। একদিন ক্লাসের মধ্যে হেড স্যার নাবিল ও তানিয়াকে দাঁড় করিয়ে বললো, কি ব্যাপার সকল শিক্ষক তোমাদের নামে আমার কাছে প্রত্যেক দিন নালিশ করে, তোমরা নাকি মোটেও পড়া-লেখা পারছো না। কেন তোমাদের কি হয়েছে? বাড়িতে পড়া-লেখা করছো না?
না স্যার, করি তো বললো নাবিল।
তাহলে পড়া পারো না কেন? দেখি হাত বাড়াও, এই বলে দুজনের হাতেই বেত দিয়ে কসে মারলো আর বললো, ঠিক আছে আজ বেশি মারলাম না। আগামিতে পড়া না পারলে দুজনের পিঠের চামড়া আস্ত রাখবো না। ঠিক আছে দুজনেই বস। আর বাড়িতে নিয়মিত পড়া লেখা করবে, বুঝেছো?
দুজনেই বললো, জি স্যার।
এরপর স্কুল ছুটির পরে বাড়িতে গিয়ে দুজনই পড়তে বসলো। কিন্তু একি হাল! একি মায়া! মাথায় পড়া ধরছেই না শুধু দুজন দুজনার কথা ভাবছে। অথচ দুজনই কেবল মাত্র ৭ম শ্রেণীর ছাত্র/ছাত্রী। দেখতে দেখতে পরিক্ষা চলে আসলো। মাসুদ সহ সবাই মনের আনন্দে পরিক্ষা দিলো। কিন্তু নাবিল ও তানিয়ার দশা খারাপ। পরিক্ষায় কিছুই কমন পরে না। এভাবে ঢিলে-ঢালা ভাবে পরিক্ষা শেষ হলো। পরিক্ষার কিছু দিন পর সবার রেজাল্ট স্কুলের দেয়ালে টাঙ্গিয়ে দিয়েছে। সবার রেজাল্ট ভালো কিন্তু ক্লাসের প্রথম ও চতুর্থ জন অকৃতকার্য হয়েছে। রেজাল্ট দেখে নাবিল ও তানিয়া অঝর ধারায় কাঁদছে। কিন্তু দুর থেকে মাসুদ অট্ট হাসিতে ভেঙ্গে পরছে। কারণ সে হয়েছে ৮ম শ্রেণীর প্রথম। যে নাবিল, তানিয়া ছিল সকল আত্মিয়-স্বজন ও সকল শিক্ষকের একমাত্র স্নেহের পাত্র। আর সেই নাবিল-তানিয়াই আজ সবার কাছে ঘৃণার পাত্র।

লেখক
সাংবাদিক, নাট্যকার 

 

আপনার মন্তব্য দিন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ হবে না। Required fields are marked *