বুয়েট মেডিক্যাল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো বিষয়ের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা হবে

এসএম নিউজ ডেস্কঃ সদ্য প্রকাশিত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে উত্তীর্ণ হয়েছে আট লক্ষাধিক শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে সাধারণ ৮ বোর্ডে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৩৩ হাজার ২৪২ জন। কিন্তু এদের সবাই সরকারি মেডিক্যাল কলেজ অথবা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) অথবা দেশের অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো সাবজেক্টে ভর্তির সুযোগ পাবে না। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অনার্স কলেজগুলো মিলে ভর্তিযোগ্য আসনসংখ্যা সাড়ে ছয় লাখ। উত্তীর্ণ আরো দেড় লাখের ভর্তি অনিশ্চিত। ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভালো বিষয়গুলোতে ভর্তির জন্য মেধাবীদেরও তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আসনসংখ্যার চেয়ে প্রার্থী বেশি হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিটি আসনের জন্য কয়েক শতাধিক প্রার্থীর মধ্য থেকে যোগ্যতা ও মেধার প্রতিযোগিতায় বিজীয় হয়ে নিজের স্থান করে নিতে হবে। আর দরিদ্র ও কম সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।
এ জন্য বিশেষায়িত ও সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির মতো অভিন্ন বা গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষার দাবি এবারো বাস্তবায়িত হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনীহা-অনাগ্রহের কারণে এবং অর্থনৈতিক লাভালাভের প্রশ্নে অভিন্ন বা গুচ্ছ পদ্ধতি কার্যকর হচ্ছে না।
শিার্থী ও তাদের অভিভাবকদের ভোগান্তি কমাতে মেডিক্যাল কলেজগুলোর মতো বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সাথে, সব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সব সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় অভিন্ন বা গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীার সুপারিশ ছিল।

চলতি শিাবর্ষে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তির বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদপে নিতে বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চ্যান্সেলর রাষ্ট্রপতি। এ নিয়ে উচ্চশিার তদারকি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) পদপে নিলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আগামীতেও এ পদ্ধতি বাস্তবায়নের কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে দরিদ্র ও কম সুযোগপ্রাপ্ত মেধাবীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হবে না।

উচ্চশিায় এবারের ভর্তিযুদ্ধ শুরু হচ্ছে অক্টোবর থেকে। চলবে আগামী বছরের মার্চের চতুর্থ সপ্তাহ পর্যন্ত। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় স্বতন্ত্রভাবে প্রতিযোগিতামূলক পরীার মাধ্যমে শিার্থী ভর্তি করার প্রস্তুতি শুরু করেছে। ফলে এবারো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে সারা দেশে ঘুরে ঘুরে শিার্থীদের পরীায় অংশ নিতে হবে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে সীমাহীন ভোগান্তি ও দুর্ভোগ পিছু ছাড়ছে না ভর্তি ইচ্ছুক শিার্থী ও তাদের অভিভাবকদের।

ইতোমধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীার সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেছে। তবে ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির তারিখ এখন পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়নি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বছর অধিভুক্ত হওয়া রাজধানীর সাত কলেজে স্নাতক শ্রেণীর জন্য পরীার মাধ্যমে শিার্থী ভর্তি করা হবে। আর ভর্তি পরীা নয়, এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফলের ভিত্তিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণীতে শিার্থী ভর্তি নেয়া হবে।
শিা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এমবিবিএস এবং স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে আসনসংখ্যা তিন লাখ। ডিগ্রি কলেজগুলোয় পাস কোর্সে রয়েছে দেড় লাখের মতো আসন। ফাজিলেও রয়েছে আরো বেশ কিছু আসন। এর বাইরে কিছু মাদরাসায় সম্মান কোর্স চালু করা হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স কলেজগুলো বাদে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আসনসংখ্যা ৫০ হাজার।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আসন আছে প্রায় এক লাখ। অবশিষ্ট দেড় লাখ এইচএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী হয় ভর্তির সুযোগ পাবে না, নয় তো ঝরে পড়ে শিক্ষাজীবনের ইতি টানবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীাপদ্ধতি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির বিদ্যমান এই প্রক্রিয়াকে ত্রুটিপূর্ণ বলছেন শিামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি গত কয়েক বছর ধরে বলেন, শিার্থীরা এইচএসসি ও সমমানের পরীায় বিভিন্ন বিষয়ে ৬০ ঘণ্টা পরীায় অংশ নেয়। আর ভর্তি পরীায় মাত্র এক ঘণ্টায় শিার্থীদের মেধা মূল্যায়ন সঠিক হয় না। তিনি বলেন, সারা দেশে ঘুরে ঘুরে ভর্তি পরীায় অংশগ্রহণে অর্থ ও সময় অপচয় হয়।

শিার্থী ও তাদের অভিভাবকদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপদ্ধতি কোচিং বাণিজ্য উৎসাহিত করে বলে মন্ত্রী মনে করেন। তিনি ভর্তি পরীক্ষা নয়, এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফলের ভিত্তিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির নীতিপদ্ধতি চালু করার পক্ষে। তার এ মত ও পদ্ধতিকে বাস্তবায়ন করছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমান কর্তৃপক্ষ।
তবে শিক্ষামন্ত্রীর এই মতের ঘোর বিরোধী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটসহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়। তারা বলছেন, উচ্চশিক্ষায় ভর্তি ইচ্ছুকদের মেধা ও যোগ্যতার যাচাই-বাছাই করেই নিতে হবে। এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা ও এর মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ। দু’টি পাবলিক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধার সঠিক যাচাই হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক শিক্ষামন্ত্রীর মতামতের ব্যাপারে প্রকাশ্যেই বিরোধিতা করে বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য ও অনভিপ্রেত।
এ পরিস্থিতিতে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি জন্য যেসব প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি অনুসরণ বা অবলম্বন করা হয়, তা নিয়ে ভর্তি ইচ্ছুকদের ভোগান্তির ও দুর্ভোগের শেষ নেই। মানসিক বা শারীরিক হয়রানির পর অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখেও পড়তে হয়।

গত শিক্ষাবর্ষে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সৈয়দা আসমা বেগম নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের সব কয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হলে, একজন প্রার্থীর অভিভাবককে শুধু আবেদনের জন্যই ৫০ হাজার টাকার বেশি খরচ করতে হয়। এ ছাড়া সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পরিবহনব্যয় এর চেয়েও বেশি পড়বে। ভর্তি ইচ্ছুক যদি মেয়ে হয় তা হলে তো, তার জন্য আরো বেশি ভোগান্তির মুখে পড়তে হবে। তিনি মন্তব্য করেন, দেশের কত শতাংশ মানুষের তার সন্তানের জন্য এত টাকা একসাথে ব্যয়ের সামর্থ্য রাখেন। এ কারণেই দরিদ্র ও কম সুযোগপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষায় আসতে পারছেন না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপ্রত্যাশী এক শিার্থীর অভিভাবক আতাউর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের সরকার জনগণের স্বার্থে সক্রিয় হয়ে থাকেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে (উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আর্থিক ও ভোগান্তি দূর করতে) সরকার নির্বিকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও নিশ্চুপ। আমার মেয়েকে নিয়ে এবার সারা দেশ ঘুরতে হবে। এরসাথে অর্থনৈতিক বিষয়ও জড়িত আছে। ভর্তি আবেদন ফি ছাড়া যাতায়াত, থাকা ও খাবার খরচ তো আছেই। মেডিক্যালের মতো একই পদ্ধতিতে পরীা নেয়া হলে অর্থ ও সময় দুই-ই বাঁচত।
অর্থনৈতিক বিনিয়োগ বা মানসিক-শারীরিক হয়রানির ও ভোগান্তিই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষায় ভর্তির জন্য বিভিন্ন ধারায় যেসব নিয়ম-কানুন এবং পদ্ধতি কর্তৃপক্ষ চালু রেখেছে, তা মোকাবেলা করে একজন শিক্ষার্থীকে ভর্তির সুযোগ পেতে নানা বাধা-প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হয়। এগুলোর অন্যতম হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে একাধিকবার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা। এ বাধা রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে। এ প্রতিবন্ধকতা চালু করতে যাচ্ছে আরো বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়। এরই মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীার সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে।

নতুন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত সরকারি কলেজেও দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীা না নেয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপ। এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরো বেশ ক’টি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
এ ছাড়া এবার থেকে, মেডিক্যালে ভর্তির েেত্রও যোগ হয়েছে নতুন শর্ত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুন নিয়মানুযায়ী একজন শিার্থী মোট দুইবার ভর্তি পরীায় অংশ নিতে পারবে। এ জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক মিলিয়ে মোট জিপিএ ১০ এর মধ্যে জিপিএ ৯ পেতে হবে। আর কোনো শিার্থী উত্তীর্ণ হোক বা না হোক, দ্বিতীয়বার পরীায় অংশ নিলে তার প্রাপ্ত নম্বর থেকে ৫ নম্বর কাটা হবে। আগে কোনো নম্বর কাটা হতো না।
উন্মক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণীতে শিার্থী ভর্তির সুযোগ নেই। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো পূর্ণাঙ্গ যাত্রা করেনি। এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত কলেজগুলোতে স্নাতক (সম্মান) এবং স্নাতক (পাস) কোর্স চালু রয়েছে। এর বাইরে ৩০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে সারা দেশ ঘুরে ঘুরে শিার্থীদের ভর্তি পরীায় অংশ নিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, এমন অবস্থায়ও ভর্তির ক্ষেত্রে তেমন কোনো সমস্যা হবে না। তবে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তুমুল প্রতিযোগিতা হবে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা এখন দিন দিন ফল ভালো করছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তিকার্যক্রম গত কয়েক বছরের মতাই অনলাইনে হবে। ভর্তি ফরম সংগ্রহ ও জমা দেয়া যাবে অনলাইনে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মোবাইল কোম্পানি টেলিটকের মাধ্যমে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরম বিতরণ ও জমা নেয়া এবং ভর্তি ফি গ্রহণ করা হবে।

আপনার মন্তব্য দিন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ হবে না। Required fields are marked *