মতিউর রহমান মল্লিকের কবিতা : মানবিক ও আধুনিক

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দঃ কবিতা মানুষকে জাগায়, মানুষও জাগিয়ে রাখে কবিতাকে। তাইতো ‘একজন কবিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যুতসই একটি কবিতাই যথেষ্ট; যেমনটি ‘বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই, মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই’ কবিতাটিই যথেষ্ট কবি যতীন্দ্র মোহন বাগচীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য; কবি আল মাহমুদ অত্যন্ত দৃঢ়ভাষায় বলেছিলেন কথাগুলো।

একেক জন কবির জন্য এ রকম একটা-দুটো সৃষ্টি তাকে জনসম্মুখে অমর করে রাখে। কারণ এ ধরনের লেখার মধ্যে থাকে আধুনিকতা ও মানবিকতার অনুরণন। অমর হয়ে থাকার মতো এমন অনেক পঙ্ক্তির নির্মাতা শক্তিমান কবি মতিউর রহমান মল্লিক। স্বদেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ়চেতা পুরুষ। পঙ্ক্তির ভাঁজে ভাঁজে তিনি নির্মাণ করেছেন দেশ-জাতি ও মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতার শৈল্পিক চেতনা। তার কাব্যভাষার আধুনিকতা এবং কবিতার পরতে পরতে মানবিকতার উচ্চারণ।

কবিতা, ছড়া এবং প্রবন্ধ-নিবন্ধেও তিনি দেশ-জাতির জন্য বলিষ্ঠ ভাষায় সাহসী উচ্চারণ করেছেন। সঙ্গীতের জগতেও ঢেউ তুলেছেন সফলভাবে। বিশ্বাসী ধারায় তিনি এক সফল স্রোত বিনির্মাণেও সফল হয়েছেন। সুরে সুরে গেয়েছেন মানতাবতার জয়গান। তিনি স্বদেশকে ভালোবেসেছেন হৃদয় দিয়ে; মমত্ববোধের রজ্জু দিয়ে স্বদেশকে বেঁধেছেন বিশ্বাসের আবহে। তাইতো দেশের বুকে যে কোনো ক্ষতচিহ্ন তাকে ব্যথিত করে, করে তোলে বিচলিত। ‘তোমার কিশোরকালের/ মত এতো পুকুরও তুমি কোথাও পাবে না/ এবং তোমার প্রগাঢ় পল্লবের মত এমন/ যৌবনও তুমি কোথাও পাবে না’। (বিলের দিকে: অনবরত বৃক্ষের গান, পৃ. ৪২)। নদীদখল আর পুকুর ভরাটের চিত্র আঁকতে গিয়ে এমন বিচলিত মনের আধুনিক পঙ্ক্তি নির্মাণ করেছেন কবি মতিউর রহমান মল্লিক।

বৈশ্বিক উষ্ণতায় বদলে যাচ্ছে ভূ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং মানবীয় ভূগোল। পানিশূন্যতা শুধু বৃক্ষের ঘরে নয় মানুষের আত্মায়ও। তাই কবিতার মতো বাঁচার আকুতি পরিবেশ বৃক্ষ এবং জৈব সমাজে। এই আকুতির সহমর্মিতায় কবিদের কাব্যচর্চা; পরিবেশ বাঁচানোর আন্দোলনে নিজেকে সরবকর্মী হিসেবে জানান দেয়ার প্রয়াস। সেই কাতারের একজন নিবেদিত কবিপুরুষ মতিউর রহমান মল্লিক। বিশ্বাসের শেকড় থেকে শরীরের লোমকূপ পর্যন্ত তিনি ছুঁয়ে দিয়েছেন কবিতার পরশ; নির্মাণ করেছেন উর্বর পলিমাটির ফসলি আস্তরণ- ফলিয়েছেন কবিতার সোনালি ফসল।

তার কবিতায় ব্যবহৃত শব্দদ্যোতনার ভাঁজে ভাঁজে মানবিক উচ্চারণ; বৃক্ষ বাঁচাও, পরিবেশ বাঁচাও, বাঁচাও প্রাণের স্পন্দন- মনুষ্যসমাজ। কারণ বৃক্ষ শুধু বৃক্ষই নয়- জীবন্ত প্রাণী; মানুষও শুধু প্রাণী নয়, জীবন্ত বৃক্ষ। বৃক্ষের শেকড় ছুঁয়েই উঠে আসে সবুজাভ প্রেম- নির্মিত হয় শান্তিময় আবাস। তাইতো বৃক্ষের বাকল ছুঁয়েই তিনি নির্মাণ করেছেন বিশ্বাসের নতুন ক্যানভাস, কবিতার মানবিক শব্দকলা। তার এ শব্দ-দর্শনে জন্ম নিয়েছে নতুন চেতনা, আবিষ্কৃত হয়েছে বিশ্বাসের পতাকা। বৃক্ষের সাথে মানবাত্মার উপমা টানতে গিয়ে তিনি বলেন- ‘একটি হৃদয় লতার মত, লজ্জাবতীর পাতার মত/ অনেক কথকতার মত।/ একটি হৃদয় ফুলের মত, সুরমা নদীর কূলের মত/ বট পাকুরের মূলের মত।’ [একটি হৃদয়, আবর্তিত তৃণলতা, পৃ.১৮]। বৃক্ষের মতোই মানুষকে বিস্তারিত হওয়ার আহ্বানে তিনি বলেন, ‘বৃক্ষের বিস্তার আছে/ হৃদয়েরও বিস্তার আছে/ খুব কম লোকই বিস্তারিত হতে পারে।, [বিস্তার, আবর্তিত তৃণলতা, পৃ.১১]

বৃক্ষকে প্রেরণার নদীর মতো দেখেছেন তিনি। বৃক্ষের হৃদয়ের গভীরতা অতল সাগরের মতো। নিখাঁদ ভালোবাসার সবক পাওয়া যায় বৃক্ষের কাছেই। তাইতো তিনি বলে উঠেনÑ ‘এই গাছের নীচেয় একটু দাঁড়াও/ হৃদয় হৃদয় হোক/ শরীরে সান্নিধ্য দিক মাতাল হাওয়া/… এসো এ গাছের নীচেয় একটু দাঁড়াই/ তারপর/ ভালবাসি পৃথিবীর সকল মানুষ।’ [গাছ সম্পর্কিত, আবর্তিত তৃণলতা, পৃ. ৩২ ] বৃক্ষ ধ্বংস মানে পরিবেশ ধ্বংস আর পরিবেশ বিপর্যয় মানেই প্রাণিজগতের বিপর্যয়, ভয়াবহ দুর্যোগ। তাইতো কবির তীব্র প্রতিবাদ- ‘পাখিদের নীড় কারা ভেঙ্গে দেয়/ আর্থিক অজগর/ উজার বনের সবুজাভ প্রেম/ বাতাসের দাপানি/ যত দ্রুত কমে বৃক্ষ এবং/ বৃক্ষের সমারোহ/ ধসে দ্রুত তত হৃদয়ের রং/ জীবনের হিমালয়।’ [ক্রমাগত, আবর্তিত তৃণলতা, পৃ.৪৬]

উপমা-উৎপ্রেক্ষার অসাধারণ ব্যবহারে কবি যেমন আধুনিকতার শেকড় ছুঁয়েছেন তেমনি জীবন-সবুজের মালা গেঁথে তিনি মানবতাবোধকে ধারণ করেছেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সৌকর্যে। তার বেশির ভাগ কবিতায় এমনতরো ছোঁয়া লেগেছে নানা রকম নান্দনিক ঢঙে। ‘অরণ্যের গভীর থেকে নেমে এলো কোকিলের নদী :/ তারপর ভেসে গেল পত্রাবলীর পাহাড়/ ভেসে গেল ডাল-পালার পথঘাট/ ভেসে গেল কুঁড়ি ও কাঁটার ঘরবাড়ী/ অথবা বৃক্ষের তীরে তীরে ডেকে গেল শিল্পকলার হাওয়া/ বসন্তের ছায়া বুঝি মৃত্তিকার গান/ তা ছাড়া ঘাসের ঘটনা থেকে রটে যায়/ নিচোলিত হরিতের ঝাঁক/ বসন্তের চোখ বুঝি নীলিমার ঢেউ/ তা ছাড়া শুকনো লতার মত উড়ে উড়ে দূরে যায়/ হতাশার চুল।’ [কবিতার ধ্রুব, অনবরত বৃক্ষের গান, পৃ. ১৬]।

কবিতা শব্দের খেলা। ছন্দ, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, বিষয়ের গভীরতা এবং ইঙ্গিতময়তাকে কবিতার প্রাণ বলা হয়। অন্য দিকে যুতসই অন্ত্যমিলও কবিতাকে পাঠকপ্রিয়তা দান করে। কবি মতিউর রহমান মল্লিক এসব বিষয়ে অত্যন্ত যতœশীল ও পরিচ্ছন্ন কবি। ‘জ্বলতে জ্বলতে আরো জ্বলে যেতে চাই’ এমন অসংখ্য অনুপ্রাস, ‘মনের মধ্যে মন পাখির মতন’ কিংবা ‘প্রতিটি পাতাই লালিত সিঁথির নদী/ প্রতিটি পাতাই প্রজাপতি পাল তোলা’ এমন অসাধারণ সব উপমা, ‘তুমি নির্জন, নীরবতা যেন রহস্যঘেরা সুদূরিকা’র মতো অসংখ্য মনোমুগ্ধকর উৎপ্রেক্ষা মল্লিকের কবিতাকে করেছে সমৃদ্ধ।

সেই সাথে ‘হৃদয়ে উঠেছে চাঁদের অধিক চাঁদ/ চাঁদের ভেতরে সাম্যের মতবাদ’ এমন অজস্র রূপকের ব্যবহার, ‘সাত সাগরের ঢেউ থামানোর জন্যে বালুর বাঁধ’-এর মতো অগণিত শ্লেষ এবং অসাধারণ সব চিত্রকল্প মল্লিকের কবিতাকে যেমন আধুনিকতার উচ্চতায় নিয়ে গেছে তেমনি জীবন্ত এবং প্রাণবন্ত করে তুলেছে তার কাব্যময়তা। বহুমাতৃক ছন্দের ব্যবহার কবি মতিউর রহমান মল্লিকের কাব্যসম্ভারকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। স্বরবৃত্ত ছন্দের পাশাপাশি অক্ষরবৃত্ত ছন্দ, মুক্তক অক্ষরবৃত্ত ছন্দ, মাত্রাবৃত্ত ছন্দসহ নানাবিধ ছন্দের পরীক্ষা-নিরীক্ষা তার কবিতাকে পাঠক হৃদয়ে বিশ্বাসের বীজ বুনতে সহায়তা করেছে। এমনকি অষ্টক ও ষষ্টকে লেখা অক্ষরবৃত্তের অসংখ্য সনেট তাকে কবিতার জগতে স্থায়ী আসন গাড়তে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে।

সত্যিকার অর্থে, আধুনিক বাংলাসাহিত্যে মতিউর রহমান মল্লিক এক স্বতন্ত্র ধারার কবি। আবর্তিত তৃণলতা, অনবরত বৃক্ষের গান, চিত্রল প্রজাপতি, তোমার ভাষায় তীক্ষ্ণ ছোরা, নিষণ্ন পাখির নীড়ে, কাব্যগ্রন্থগুলোয় তিনি যেমন নিজেকে মেলে ধরেছেন আধুনিকতা এবং মানবিকতার মায়ার চাদরে তেমনি ছড়াগ্রন্থ ‘রঙিন মেঘের পালকি’তে তিনি উড়িয়েছেন স্বপ্নজাদু। গীতলতাকে ধারণ করে আধুনিক শব্দচয়ন, উপমায় শেকড়ের ডাক, ঐতিহ্যের অনুসন্ধান এবং বিষয়বস্তু নির্বাচনে বিশ্বাস ও মানবতাকে অবলিলায় ঠাঁই দিয়েছেন তার কবিতায়।

কবিতার প্রতিটি শব্দ-বাক্য উপমা-উৎপ্রেক্ষা আঙ্গিক নির্মাণে তিনি মননশীলতার পথে হেঁটেছেন। তৈরি করেছেন স্বকীয় ঢঙে আধুনিক কাব্যভাষা- যা একজন কবির জন্য অপরিহার্য বিষয়। তার কাব্যভাষার যে আধুনিকতা, শব্দের তৎসমতা ব্যবহাররীতি, নন্দিত শব্দের উৎসারণ সব কিছু তার নিজস্ব ঢঙে। ঐতিহ্যের ব্যবহার ও দেশজ অনুসঙ্গের দ্যোতনা তার কবিতাকে হৃদয়গ্রাহ্য করে তুলেছে। সেই সাথে কবিদের কাজ স্বপ্ন দেখানো।

কাজী নজরুল ইসলামও বলেছেন, ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে’; কবি ফররুখ আহমদ তাই ডাক দিয়েছেন- ‘ছিঁড়ে ফেলো আজ আয়েশি রাতের মখমল অবসাদ/ নতুন পানিতে হাল খুলে দাও, হে মাঝি সিন্দবাদ’। পূর্বসূরিদের এমন আহ্বানে সর্বান্তকরণে জেগে উঠেছিলেন কবি মতিউর রহমান মল্লিক। জেগে উঠেছিলেন শুধু লেখনীতে নয়; বাস্তব জীবনের পদে পদে তা বাস্তবায়নের আপ্রাণ চেষ্টা সাধনাও করে গেছেন। তাইতো তিনি মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত সব পাঠকের হৃদয়ের কবি, ভালোবাসার কবি, স্বপ্ন-প্রেরণার কবি।

আপনার মন্তব্য দিন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ হবে না। Required fields are marked *