মূল ইস্যুতে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে আ. লীগ-বিএনপি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে দেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যেসব প্রস্তাব দিয়েছে তাতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে উভয় দল পরস্পর বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে।

আওয়ামী লীগ গতকাল বুধবার সংলাপে নির্বাচনে সেনা নিয়োগ সম্পর্কে বলেছে, “তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিন এবং ইসি নির্ধারিত নির্বাচন-পরবর্তী সময়ের জন্য প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর ওপর ন্যস্ত থাকবে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কোন পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের নিয়োগ করা যাবে তা ১৮৯৮ সালের প্রণীত ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৯ থেকে ১৩১ ধারায় এবং সেনা বিধিমালা ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ শিরোনামে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। ”গত রবিবার সংলাপে একই বিষয়ে বিএনপির প্রস্তাব ছিল, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-তে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় ‘প্রতিরক্ষা

বাহিনীকে’ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নির্বাচনের কমপক্ষে এক সপ্তাহ আগে থেকে নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনী আসনে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল ক্ষমতা দিয়ে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়োজিত করতে হবে। সব নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক টহলসহ ভোট গ্রহণের দিন ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতিরক্ষা বাহিনী মোতায়েন করতে হবে।

প্রসঙ্গত, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় পুলিশ, বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি), র‌্যাব, আনসার, কোস্ট গার্ড থাকলেও প্রতিরক্ষা বাহিনী নেই। ২০০৯ সালে ওই সংজ্ঞা থেকে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে বাদ দেওয়া হয়।

বিএনপির প্রস্তাব হচ্ছে, সংসদ নির্বাচনের তারিখের ন্যূনতম ৯০ দিন আগে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে সংবিধানে বর্ণিত নির্বাচনসংক্রান্ত  নির্দেশনা ও বর্তমান নির্বাচনী আইন ও বিধিমালা কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের বিস্তারিত প্রস্তাবে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ নির্বাচন পরিচালনার জন্য আবশ্যকীয় সব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে ন্যস্ত করা এবং নির্বাচনকালীন সরকারের কর্মপরিধি কেবল আবশ্যকীয় দৈনন্দিন (রুটিন) কার্যাবলীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা বলা হলেও প্রস্তাবে সারসংক্ষেপে তা উল্লেখ করা হয়নি।

ইভিএম সম্পর্কে বিএনপির প্রস্তাব হচ্ছে, ইভিএম বা ডিভিএমে ভোট গ্রহণ করা যাবে না। একই বিষয়ে আওয়ামী লীগ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিয়েছে।

সীমানা পুনর্নির্ধারণ সম্পর্কে বিএনপির প্রস্তাব হলো, ২০০৮ সালের আগের সংসদীয় আসনের সীমানা বহাল রাখতে হবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সীমানা পুনর্নিধারণের বিষয়টি বিশেষ করে আদমশুমারির সঙ্গে সম্পর্কিত। সর্বশেষ ২০১১ সালে আদমশুমারির ওপর ভিত্তি করে (যা ২০১৩ সালে প্রকাশিত) ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনের আগে সীমানা পুনর্নিধারণ করা  হয়েছে। নতুন আদমশুমারি ছাড়া পুনরায় সীমানা পুনর্নির্ধারণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে বিভিন্ন আইনগত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

এ ছাড়া বিএনপির প্রস্তাবে এখন থেকেই রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশসহ সব স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে বলা হয়, বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কার্যক্রম পালনে অনুমতিও পাচ্ছে না। সরকারের বাধার কারণে বিরোধী মতের দলগুলো ঘরোয়াভাবে কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানেও একত্রিত হতে পারছে না। এমনকি ইফতার পার্টির মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং দুস্থদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের মতো মানবিক কার্যক্রমেও বাধার সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাই এখন থেকেই সব রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশসহ সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কারো প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা থেকে প্রশাসনকে বিরত রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

কিন্তু এসব সমস্যা সমাধানে আওয়ামী লীগের প্রস্তাবে কোনো প্রস্তাব বা পরামর্শ নেই।

আপনার মন্তব্য দিন

আপনার ই-মেইল এড্রেস প্রকাশ হবে না। Required fields are marked *